ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে কে, সামনে কী?
- আপলোড সময় : ০৫-০১-২০২৬ ০৯:৫৯:৪৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৫-০১-২০২৬ ০৯:৫৯:৪৯ পূর্বাহ্ন
সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
ভেনেজুয়েলায় নাটকীয় সামরিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে বন্দি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রা¤প ঘোষণা দিয়েছেন, সঠিক ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই দেশটি চালাবে। এই ঘটনার পর ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী এক রাতের অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে রাজধানী কারাকাসের তাদের বাসভবন অপহরণ করে। অভিযানের সময় ভেনেজুয়েলার কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলাও চালানো হয়। পরে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। নিউ ইয়র্কে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক-সংক্রান্ত মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
কীভাবে চালানো হয় অভিযান :
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রা¤প জানান, স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে ভেনেজুয়েলায় অভিযান শুরু হয়। তিনি বলেন, কারাকাসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয় মার্কিন বাহিনী। যদিও কীভাবে তা করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। ট্রা¤েপর ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরো একটি সুরক্ষিত নিরাপদ কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। দরজা পার হলেও সেটি বন্ধ করতে পারেননি।
মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ডেল্টা ফোর্স মাদুরোকে আটক করে। অভিযানে সিআইএ-র একটি সূত্র ভেনেজুয়েলার সরকারের ভেতর থেকে মাদুরোর অবস্থান শনাক্তে সহায়তা করে বলে জানান ট্রা¤প। তিনি দাবি করেন, অভিযানে কোনও মার্কিন সেনা নিহত হয়নি, অল্পসংখ্যক আহত হয়েছে। অভিযানে ১৫০টির বেশি বিমান ব্যবহৃত হয়।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে প্রথমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায় তোলা হয়। সেখান থেকে বিমানে করে তাদের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড ঘাঁটিতে আনা হয়। পরে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় চালানো বিমান হামলাগুলো মূলত এই ‘এক্সট্রাকশন’ অভিযানের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিবিসি যাচাই করে পাঁচটি লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে লা কার্লোটা নামে পরিচিত জেনারেলিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা বিমানঘাঁটি, ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক স্থাপনা, কারাকাসের প্রধান সমুদ্রবন্দর লা গুয়াইরা, হিগুয়েরোতে বিমানবন্দর এবং অ্যান্টেনাস এল ভলকান টেলিযোগাযোগ টাওয়ার।
এখন ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে কে? :
ডোনাল্ড ট্রা¤প বলেছেন, নিরাপদ ও যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। তবে এই পরিচালনা কীভাবে হবে বা কারা এতে যুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। তিনি বলেন, এটি হবে একটি দলগত প্রচেষ্টা।
ট্রা¤প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রোদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট তাকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাম ঘোষণা করেছে। ট্রাম্পের দাবি, রোদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র যা চাইবে, তা করতে রাজি হয়েছেন।
তবে পরে রোদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে মাদুরোর মুক্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার ‘একমাত্র প্রেসিডেন্ট’।
ট্রা¤প জানান, তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে কথা বলেননি। তার মতে, মাচাদোর ভেনেজুয়েলার ভেতরে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। এর আগে মাচাদো এডমুন্দো গনজালেসকে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে গনসালেসের পক্ষে তিনি ব্যাপক সমর্থন জোগাড় করেছিলেন এবং তার দলের প্রকাশিত ভোটের ফল অনুযায়ী গনজালেস বড় ব্যবধানে জয়ী হন।
সামনে কী হতে পারে? :
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় আর কোনও সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা নেই। তবে ট্রাম্প এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, মাঠে সেনা নামাতে আমরা ভয় পাই না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় ঢুকে অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।
ট্রাম্পের মতে, মাটি থেকে বিপুল সম্পদ তোলা হবে, যা ভেনেজুয়েলার জনগণ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাজে লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যয় করা অর্থ ফেরত নেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি অন্য দেশগুলোতে তেল বিক্রির কথাও বলেছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলা সরকার এই হামলাকে দেশের ‘কৌশলগত স¤পদ, বিশেষ করে তেল ও খনিজ’ দখলের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। সরকারের মতে, এটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভাঙার প্রচেষ্টা। বিশ্বের প্রমাণিত সবচেয়ে বড় তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। তবে দেশটির তেল ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত, যা পরিশোধন করা তুলনামূলক কঠিন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ :
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানান, নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নার্কো-সন্ত্রাসে ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানি, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। বন্ডি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হবেন।
মাদুরো কে এবং কেন তাকে আটক করা হলো :
হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে রাজনীতিতে উঠে আসেন নিকোলাস মাদুরো। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তিনি প্রেসিডেন্ট হন। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুলসংখ্যক ভেনেজুয়েলান অভিবাসীর আগমন এবং মাদক প্রবাহ নিয়ে ট্রা¤প প্রশাসনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার দুটি মাদকচক্র ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্তেল দে লস সোলেসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। ট্রা¤প দাবি করেছেন, কার্তেল দে লস সোলেসের নেতৃত্বে ছিলেন মাদুরো। মাদুরো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মাদকবিরোধী যুদ্ধকে অজুহাত করে যুক্তরাষ্ট্র তাকে উৎখাত ও ভেনেজুয়েলার তেল দখল করতে চায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী একাধিক হামলা চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া :
এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলো। রাশিয়া একে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে নিন্দা করেছে। চীন ও ইরানও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। কলম্বিয়া ও ব্রাজিলসহ বহু লাতিন আমেরিকান দেশ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল একে ‘অপরাধমূলক হামলা’ বলেছেন। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘স্বাধীনতা এগিয়ে যাচ্ছে’ লিখেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, মাদুরোর শাসনের অবসানে তার সরকার কান্নাকাটি করবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানালেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার কথা বলেছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক